বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ রাজনারায়ণ বসু এবং তাঁর দৌহিত্র, বিপ্লবী-দার্শনিক ঋষি অরবিন্দ ঘোষ-এর মেদিনীপুরের ঐতিহাসিক বাসভবনটি আজ চরম অবহেলায় ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে। মেদিনীপুর কোতোয়ালি থানা এলাকার অন্তর্গত এই প্রাচীন বাড়িটি বর্তমানে মেদিনীপুর কলেজ এবং মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলের আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সঠিক দেখভালের অভাবে ভবনটি এখন জঙ্গল ও আগাছায় ছেয়ে গেছে।
রাজনারায়ণ বসুর দ্বিশত জন্মবর্ষ পার হলেও বাড়িটির এই করুণ দশা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় ইতিহাসবিদরা। রাজ্য সরকারের কাছে তাঁদের বিনীত আবেদন—আইনি বিবাদ মিটিয়ে এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে অভিলম্বে 'হেরিটেজ' বা প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য ভবন হিসেবে ঘোষণা করা হোক এবং সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এই বাসভবনটির অবদান অত্যন্ত গভীর:
পারিবারিক ও ঐতিহাসিক মাইলফলক:মেদিনীপুর জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন রাজনারায়ণ বসু এই বাড়িতেই বসবাস করতেন। ১৮৬১ সালে তাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যা স্বর্ণলতা দেবী—যিনি অরবিন্দ ঘোষের মা—তাঁর বিবাহ এই বাড়ি থেকেই সম্পন্ন হয়।
বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল: ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় এই বাড়িটি গুপ্ত সমিতির বৈঠক এবং বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড সংগঠনের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল।
আইনি জটিলতা ও বর্তমান অবস্থা
মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল এবং মেদিনীপুর কলেজের মধ্যে জমি ও মালিকানা সংক্রান্ত মামলা আদালতে গড়ানোর ফলে এটি তালাবন্ধ অবস্থায় রয়েছে। ইতিপূর্বে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হলেও আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে এর কোনো সমাধান হয়নি।
পরিবার ও গবেষকদের বক্তব্য
রাহুল ঘোষ (পরিবারের সদস্য): তিনি হতাশা প্রকাশ করে জানান, ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত ভবনটি আজ ঝোপঝাড় আর জঞ্জালে ভরে গেছে। দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিয়ে প্রশাসনের মধ্যস্থতায় আইনি বিবাদ মিটিয়ে এটিকে দ্রুত সংরক্ষণ করার দাবি জানান তিনি।
সাগরিকা ঘোষ (পরিবারের সদস্য): তিনি বলেন, "রাজনারায়ণ বসুর দ্বিশত জন্মবর্ষ উদযাপন করা হলেও তাঁর নিজের বাড়িটি এভাবে পরিত্যক্ত পড়ে থাকা দুঃখজনক। এটি উদ্ধার করে হেরিটেজ ঘোষণা করাই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো।"
অধ্যাপিকা অপর্ণিতা ভট্টাচার্য(ইতিহাস বিভাগ, মেদিনীপুর কলেজ): তিনি উল্লেখ করেন, বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মেদিনীপুরের বিপ্লবী ইতিহাসের সাথে এই বাড়িটির যোগসূত্র অচ্ছেদ্য। অবিলম্বে ভবনটিকে সংস্কার করে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে রক্ষা করা উচিত।